নতুন মাস্টার

আমাদের ক্লাসটিচার হক সাহেব রিটায়ার করেছেন। তাঁর বদলে আজ নাকি একজন নতুন মাস্টার আসবেন। আমাদের ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের সেরা শয়তানগুলি মানে আমি, করিম, ইকবাল, সিরাজ আর নাসির একথা শুনে তো একবারে মেতে উঠলাম। ক্লাসে এসেই হৈ চৈ শুরু করে দিলাম। নাসির আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল: কিছু ভেবেছিস, কি করবি?

আমি বললাম: ওসব সিরাজই আমার চেয়ে ভাল জানে।

সিরাজ বলল: তোরা কিসুটি ভাববিনে। আমি তো রয়েছি। ক্লাস আরম্ভ হলেই মজা দেখতে পাবি।

সিরাজের উপর আমাদের বেশ ভরসা। আমাদের ধারণা, সিরাজের বুদ্ধি আমাদের সকলের চেয়ে তীক্ষ্ণ (অবশ্য পড়াশোনার বেলায় তার মাথা আমাদের মতই অচল)। তাই সিরাজের উপর আমাদের সকলেরই আস্থা আছে। করিম বলল: কিন্তু দেখো, ফাস্ট বয় আর সেকেণ্ড বয়ই সব গণ্ডগোল বাধাবে।

: হাঁ, তাই তো। নূরুল, আরিফ, মঞ্জুর, জাহিদ, মহিম এরা সবাই ভাল ছাত্রের দল। স্যারের কাছে এরা এত অনুগত ও বাধ্য থাকে যে, মনে হয়, এদের জন্ম-মৃত্যু সবই যেন স্যারেরই হাতে। ক্লাসের সব পড়া চটপট বলে দেয়, আর মার খেতে হয় আমাদের। এরা যদি এই নতুন স্যারকেও তেমনি আনুগত্য দেখাতে শুরু করে, তবে নতুন স্যারকে নিয়ে মজা করার আনন্দটুকু একেবারে বাষ্পের মত (কর্পূরের মত নয়) উড়ে যাবে।

নূরুল, মঞ্জুর আর আরিফ ততক্ষণে স্কুলে এসেছে। আমি গিয়ে তাদের বোঝাতে শুরু করলাম যেন আজকের দিনটা চুপ করে থাকে। নতুন স্যারকে নিয়ে যখন ফাজলামো করব তখন যেন তারা দয়া করে স্যারের কাছে আমাদের নামটা না বলে দেয়। মঞ্জুর আর নূরুল অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়ত্তে এসে গেল। কিন্তু আরিফ গোঁ ছাড়ে না। যেমনি গোঁড়া মুসলমান আরিফ, তেমনি গোঁড়া ভাল ছাত্র। সে আমাদের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে লাগল যে মাস্টারের সাথে এসব করা অন্যায়, এতে ইহকালও নষ্ট হয়, পরকালও ঝরঝরে হয়ে যায়।

আমরাও নাছোড়বান্দা। অনেক বোঝানোর পর এবং চার আনার ডালমুট খাওয়ানোর লোভদেখিয়ে তাকে রাজী করানো গেল।

ঢং ঢং ক্লাস আরম্ভ হবার ঘণ্টা পড়ল। আমরা গভীর উত্তেজনা নিয়ে বসে রইলাম কখন স্যার আসে। 'সেকেণ্ড বেল' পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। গম্ভীর মুখ। চোখে চশমা পরা। বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। তিরিশ বললেও কেউ অবিশ্বাস করবে না, আবার পঁয়তাল্লিশ বললেও সকলে বিশ্বাস করবে। স্যারের এক হাতে 'রেজিস্টার বুক' আর অন্য হাতে একটা ডায়রী ও কতগুলি বই পুস্তক।

স্যার ক্লাসে ঢুকেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ক্লাসের চারিদিকে দেখলেন। তারপর বসে নাম ডাকতে আরম্ভ করলেন। সকলেই 'ইয়েস স্যার' 'প্রেজেন্ট স্যার' বলে চলেছে। আমার পালা আসতেই বললাম: 'হাজির স্যার'। চমকে স্যার আমার দিকে তাকালেন। গ্রাম্য পাঠশালায় এভাবে প্রেজেন্ট করার নিয়ম আছে কিনা বলতে পারিনে কিন্তু ঢাকা শহরের একটি নামকরা ইংরেজীমার্কা হাই স্কুলে এভাবে নাম প্রেজেন্ট করার রীতি কোন কালেই ছিল না বলেই মনে হয় এবং থাকলেও এখন আর নেই। স্যারের মুখ থেকে প্রথম কথা বেরুল: এভাবে নাম উত্তর দেওয়ার মানে?

আমি দাঁড়িয়ে বললাম: মানে আবার কি স্যার, রাজভাষায় নাম প্রেজেন্ট করা কি ঠিক? স্যার বললেন: ও!

তারপর আবার নাম ডাকতে শুরু করলেন। নাম ডাকা শেষ হলে স্যার উঠে দাঁড়ালেন। একটা কবিতা পড়াতে আরম্ভ করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে পেছনের বেঞ্চ থেকে সিরাজ আর নাসির স্যারের সাথে সাথে সুর করে কবিতা পড়তে শুরু করল। সারা ক্লাসে একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল। এক মুহূর্তে স্যারের কবিতা পড়ানো বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ স্যারের মুখে কোন কথা যোগাল না। তারপর হঠাৎ যেন কি মনে হল। বললেন: আরে তোমাদের সকলের নামই ত জানা হয় নি আমার।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion